প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে ইসলামি নির্দেশনা

মহান আল্লাহ তাআলা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে কিছু সৃষ্টিকে আমরা কখনো অস্বাভাবিক দেখতে পাই। এতে তাঁর বিশেষ উদ্দেশ্য ও মহান রহস্য বিদ্যমান।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রতিবন্ধী মানুষের সৃষ্টির রহস্য হলোঃ

প্রথমত, বান্দা যেন তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে, তিনি যেমন স্বাভাবিক সুন্দর সৃষ্টি করতে সক্ষম, তেমনি এর ব্যতিক্রমও করতে সক্ষম।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ যাকে বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন; সে যেন নিজের ওপর আল্লাহর দয়া ও অনুকম্পাকে স্মরণ করে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কারণ, আল্লাহ চাইলে তার ক্ষেত্রেও সে রকম করতে পারতেন।

তৃতীয়ত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা এই সমস্যার বিনিময়ে তাঁর সন্তুষ্টি, দয়া, ক্ষমা ও জান্নাত দিতে চান। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি যার প্রিয় চোখ নিয়ে নিই, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং নেকির আশা করে; আমি তার জন্য এর বিনিময়ে জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হই না।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর ১৯৫৯)।

ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী

নবী করিম রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নাও এবং বন্দীকে মুক্ত করে দাও।’ (বুখারি)।

প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে ইসলামি নির্দেশনা
প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানো মানবতার দাবি ও ইমানি দায়িত্ব

ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে সদাচরণ করা, সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক। প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানো মানবতার দাবি ও ইমানি দায়িত্ব। প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে অসদাচরণ বা তাদের উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা ঠাট্টা-তামাশা করা স্রষ্টাকে তথা আল্লাহকে উপহাস করার শামিল।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইকে সাহায্য করে, আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করেন।’ (মুসলিম)।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আর তাদের ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিত ব্যক্তিদের হক বা অধিকার রয়েছে।’ (সূরা জারিয়াত, আয়াত: ১৯)।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিজন। আল্লাহর কাছে প্রিয় সৃষ্টি সে, যে তাঁর সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণ করে।’ প্রিয় নবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে ফল খাওয়াবেন। যে তৃষ্ণার্তকে পানি পান করায়, আল্লাহ জান্নাতে তাকে শরবত পান করাবেন। যে কোনো দরিদ্রকে বস্ত্র দান করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে উত্তম পোশাক দান করবেন।’ (তিরমিজি)।

ইসলামে প্রতিবন্ধীর গুরুত্ব ও মর্যাদা

প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে ইসলামি নির্দেশনা
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিবন্ধী

ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। ইমান ও তাকওয়া হচ্ছে মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড। যে যত বেশি মুত্তাকি, আল্লাহ তাকে তত বেশি ভালোবাসেন।

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে; পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে বেশি মুত্তাকি।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)।

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের শরীর ও আকৃতির দিকে দেখেন না; বরং তিনি তোমাদের অন্তরের দিকে দেখেন।’ (মুসলিম)।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা, যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে; কেননা, যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)।

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের সামাজিক স্বীকৃতি

প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিকবার তাঁর অনুপস্থিতির সময় মদিনার মসজিদে নববিতে ইমামতির দায়িত্ব এক প্রতিবন্ধী সাহাবির ওপর অর্পণ করে তাদের সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করার নজির তৈরি করেন। তিনি সেই প্রতিবন্ধী সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) – কে আজান দেওয়ার কাজেও নিযুক্ত করেছিলেন। (বুখারি, অধ্যায়: মাগাজি, অনুচ্ছেদ: বদর ও ওহুদের যুদ্ধ)।

প্রিয় নবী (সা.) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে তাঁর অপার ভালোবাসায় ধন্য করেছেন। তিনি যখনই তাঁকে দেখতেন, তখনই বলতেন, ‘স্বাগত জানাই তাকে, যার সম্পর্কে আমার প্রতিপালক আমাকে সতর্ক করেছেন।’ পরে মহানবী (সা.) এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সাহাবিকে দুবার মদিনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি ভালোবাসা রাসুলুল্লাহ (সা.) – এর অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় সুন্নত। (মুসলিম)।

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের জন্য ছাড়

ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ বিধানে প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে সহজতা ও সহনশীলতা। তাই এমন প্রতিবন্ধী, যে ইসলামের বিধান পালনে একেবারে অক্ষম, যেমন পাগল ও জ্ঞানশূন্য ব্যক্তি, তার ওপর ইসলাম কোনো বিধান জরুরি করে না। আর আংশিক প্রতিবন্ধী যে কিছুটা করতে সক্ষম, তার প্রতি অতটুকুই পালনের আদেশ দেয়। ফরজ বিধান যা মহান আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন, যদি মানুষ তা পালনে সক্ষম হয়, তাহলে তার প্রতি তা আবশ্যিক হবে। আর যদি সে তাতে অক্ষম হয়, তাহলে তা থেকে সে মুক্তি পাবে। অর্থাৎ, যে পরিমাণ পালন করতে সক্ষম হবে, সে পরিমাণ তাকে পালন করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)।

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যখন আমি তোমাদের কোনো আদেশ করি, তখন তা বাস্তবায়ন করো, যতখানি সাধ্য রাখো।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির করণীয়ঃ

প্রথমত, ধৈর্য ধারণ করবে এবং সন্তুষ্ট থাকবে। কারণ, এটি তার ভাগ্যের লিখন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের ওপর কোনো বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগৎ সৃষ্টির আগেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা যা হারাও, তাতে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তাতে উল্লসিত না হও। আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা হাদিদ, আয়াত: ২২-২৩)।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বাস রাখবে, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনকে পরীক্ষায় ফেলেন, তখন তিনি তাকে ভালোবাসেন এবং অন্যদের থেকে তাকে অগ্রাধিকার দেন। তাই তিনি নবীদের সবচেয়ে বেশি বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন।

নবী করিম রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নবীরা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন, অতঃপর তাঁদের থেকে যাঁরা নিকট স্তরের। মানুষকে তার বিশ্বাস অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া হয়। যদি তার ইমান শক্তিশালী হয়, তাহলে তার পরীক্ষা কঠিন হয়। আর যদি তার ইমান দুর্বল হয়, তাহলে তার পরীক্ষাও সে অনুযায়ী হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না। পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর ১৪৩ ও ইবন মাজাহ)।

তৃতীয়ত, মনে রাখবে যে দয়ালু আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিকে তার প্রতিটি কষ্টের বিনিময় দেন, যদি সেই কষ্ট নগণ্যও হয়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘মুসলিম ব্যক্তিকে কষ্ট, ক্লান্তি, দুঃখ, চিন্তা, আঘাত, দুশ্চিন্তা গ্রাস করলে এমনকি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ তাআলা সেটা তার পাপের কাফ্ফারা করে দেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

চতুর্থত, মুমিন ব্যক্তি যেন তার নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধিতাকে ভুলে গিয়ে শরীরের বাকি অঙ্গগুলোকে কাজে লাগায়। কারণ, কোনো এক অঙ্গের অচলতা জীবনের শেষ নয়। দেখা গেছে, যার কোনো একটি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ অচল, তার বাকি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গগুলো বেশি সক্রিয় ও সচল।

প্রতিবন্ধীদের জন্য আমাদের করণীয়ঃ

নিজের সুস্থতা ও পূর্ণতার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের জন্য দোয়া করা। যথাসম্ভব প্রতিবন্ধীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। প্রতিবন্ধীর দেখাশোনা করা তার অভিভাবকের কর্তব্য হলেও সমষ্টিগতভাবে তা সমাজের সবারই দায়িত্ব।

জন্মগত প্রতিবন্ধী হোক কিংবা দুর্ঘটনাজনিত প্রতিবন্ধীই হোক; ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের বিভেদ ভুলে তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা আমাদের কর্তব্য।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু।

দেশে ও সমাজ বদলের জন্য প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা, সক্ষমতা ও সদিচ্ছা।

প্রথম প্রকাশিত হয় HOH 4.10.2014

প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে ইসলামি নির্দেশনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *