পবিত্র রমজানে জুমার নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজানেই আল্লাহ’র ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে নিজেদের সকল গোনাহ মাফ করিয়ে নিতে হবে প্রতিটি মুসলিমের। এটিই রমজান মাসের দাবি ও শিক্ষা। মাহে রমজানে জুমার দিনের গুরুত্ব-মহাত্ম অপরিসীম। সাধারণত সপ্তাহের অন্যদিনগুলোর চেয়ে জুমার দিনের গুরুত্ব অনেক বেশি। জুমার এ দিনটিকে মুসলমানদের জন্য ইবাদতের দিন বলা হয়।

পবিত্র রমজানে জুমার নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলতরমজানে জুমার দিনে মুসল্লীদের দোয়া কবুল হয়। জুমার নামাজ মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং এই ইবাদতে আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত। কোরআনুল করীমে বর্ণিত আছে, ‘হে ঈমানদারগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য দ্রুত যাও এবং ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।’ (সূরা জুমআ : আয়াত ৯)

জুমার দিনের ফজিলত বর্ণনা করে বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থ বুখারী শরীফে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত আছে। সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন জানাবাত গোসলের ন্যায় গোসল করে, নামাজের জন্য মসজিদে আগে আগমন করে সে যেন একটি উট কোরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করে সে যেন একটি গাভী কোরবানী করল। যে তৃতীয় পর্যায়ে আগমন করে সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কোরবানী করল। চতুর্থ পর্যায়ে যে আসল সে যেন একটি মুরগী কোরবানী করল, পঞ্চম পর্যায়ে যে আসল সে যেন একটি ডিম কোরবানী করল। পরে ইমাম যখন খুতবা দেওয়ার জন্য বের হন তখন ফিরিশতাগণ যিকর শোনার জন্য হাজির হয়ে থাকেন। (বুখারী ২য় খণ্ড ৮৩৮)

আরেকটি হাদিসে রয়েছে, হযরত সালমান ফার্সী (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিনে গোসল করে, যথাসাধ্য ভালরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, নিজের তেল ব্যবহার করে, নিজের ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে এরপর বের হয় এবং দুজন লোকের মাঝে ফাঁক না করে তারপর তার নির্ধারিত নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় চুপ থাকে তাহলে তার জুমআ থেকে আরেক জুমআ পর্যন্ত সময়ের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারী ২য় খণ্ড ৮৩৯)

জুমার দিনকে মুসলমানদের জন্য ইবাদতের দিন ও দোয়া কবুল হওয়ার দিন বলা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মহান দিন। এ দিনটির সম্মান ও মর্যাদার জন্য ইহুদি-নাসারাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা দিনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরবর্তীতে ইহুদিরা শনিবারকে আর খ্রিস্টানরা রোববারকে তাদের উপাসনার দিন নির্ধারণ করলেও আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জন্য শুক্রবারকে ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, এক ইয়াহুদি তাঁকে বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহুদি জাতির ওপর অবতীর্ণ হতো, তবে অবশ্যই আমরা সেই দিনকে ঈদ হিসেবে পালন করতাম, তিনি বললেন, ‘কোন আয়াত’? সে বলল, ‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ (সূরা মায়েদা : আয়াত ৩) হজরত ওমর বললেন, ‘এটি যে দিনে এবং যে স্থানে রাসূল (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি। তিনি সেদিন আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুমুআ’র দিন।’ (বুখারি)

হাদিসে আছে, হে মুসলমানগণ! জুমার দিনকে আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের জন্য (সাপ্তাহিক) ঈদের দিন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। তোমরা এদিন মিসওয়াক কর, গোসল কর ও সুগন্ধি লাগাও।’ (মুয়াত্তা, ইবনু মাজাহ, মিশকাত)। হাদিসে আরো বলা হয়েছে, জান্নাতে প্রতি জুমার দিনে জান্নাতিদের হাট বসবে। জান্নাতি লোকেরা সেখানে একত্রিত হবেন। সেখানে এমন মনমুগ্ধকর হাওয়া বইবে, যে হাওয়ায় জান্নাতিদের সৌন্দর্য অনেক গুণে বেড়ে যাবে এবং তাদের স্ত্রীরা তা দেখে অভিভূত হবে। অনুরূপ সৌন্দর্য বৃদ্ধি স্ত্রীদের বেলায়ও হবে। (মুসলিম)

জুমার রাতে বা দিনে যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে মারা যান; আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের আজাব থেকে মুক্তি দেন।’ (তিরমিজি)

জুমার ফজিলত যদি বলতে হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। তারপরও সংক্ষেপে এর কিছু বর্ণনা দেওয়া হলো- এই পবিত্র জুমার দিনে হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল; এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল (আবু দাউদ) এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল (মুসলিম)। এই দিনে তাঁকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল, এই দিনেই তাঁর তওবা কবুল করা হয়েছিল এবং এই দিনেই তাঁর রূহু কবজ করা হয়েছিল (আবু দাউদ)। পবিত্র জুমার দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, এই দিনেই কিয়ামত হবে, এই দিনেই সকলেই বেহুঁশ হয়ে যাবে (আবু দাউদ)। জুমার দিন নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ, আকাশ, পৃথিবী, বায়ূ পাহাড়, সমুদ্র সবই ক্বিয়ামত হবার ভয়ে ভীত থাকে।’ (মুয়াত্তা, ইবনু মাজাহ, মিশকাত)

আজ মুসলমানদের জন্য দোয়া কবুল হওয়ার দিন। আসুন! মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সঠিকভাবে পবিত্র জুমার নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে নিজের, পরিবার, মা-বাবা, আত্মীয় স্বজন ও বিশ্ব মুসলিমের অতীত গুনাহের জন্য ক্ষমা চাই। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে ইসলামের সঠিক পথে চলার তওফিক দিন।

পবিত্র রমজানে জুমার নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *